বোম্বাইয়ের মানি ভবন, জুলাই ১৯২১। ICS পাস করে চাকরিই ছেড়ে দেশে ফেরা এক তরুণ এলেন গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে। কথা শুরু হলো, কিন্তু মন ভরল না — সে চায় ঝড়ো পথ, গান্ধীজি বলছেন ধৈর্যের আন্দোলন। গান্ধীজি চোখের সেই আগুনটা দেখে নিয়েছিলেন। শেষে একটি লাইন: কলকাতায় যান, দেশবন্ধুর সঙ্গে দেখা করুন।
সেই এক পরামর্শেই শুরু ভারতীয় রাজনীতির এক অসাধারণ সম্পর্ক। নেতাজির রাজনৈতিক গুরু ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস — কিন্তু এই গুরু-শিষ্যের পুরো গল্পটা এখনও কম মানুষই জানে। Techedu360-তে আমরা ঠিক এরকম কম-জানা ইতিহাসের পৃষ্ঠাই খুলতে চাই।
এই লেখায় আমরা জানব:
- কেমব্রিজের চিঠি দিয়ে শুরু হওয়া সম্পর্ক আর জেলখানার বন্ধুত্ব
- কর্পোরেশনে মেয়র গুরু আর অফিসার শিষ্যের দিনগুলো
- বেঙ্গল প্যাক্ট — গুরুর স্বপ্ন, শিষ্যের খসড়া
- দার্জিলিংয়ের শোক আর মান্দালয়ের সেই চিঠি
- গুরু চলে গেলেও শিষ্যের মধ্যে কী কী থেকে গেল
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস কে ছিলেন?
চিত্তরঞ্জন দাশ জন্ম ৫ নভেম্বর ১৮৭০, কলকাতায়। মজার ব্যাপার, তাঁদের পৈতৃক বাড়ি কিন্তু আজকের বাংলাদেশে — মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে। বাবা ভূবনমোহন দাশ ছিলেন সলিসিটর।
ইংল্যান্ডে ব্যারিস্টারি শেষ করে ফেরেন ১৮৯৪ সালে। ১৯০৮-এর আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি লড়েছিলেন অরবিন্দ ঘোষের পক্ষে; অরবিন্দ বেকসুর খালাস পান, আর চিত্তরঞ্জন রাতারাতি সেরা আইনজীবীর খ্যাতি পান। পরে ঢাকা ষড়যন্ত্র মামলায়ও (১৯১০–১১) তিনি ছিলেন বিবাদিপক্ষের কৌঁসুলি — সূত্র: বাংলাপিডিয়া।
তারপর অসহযোগ আন্দোলনে তিনি ফেলে দিলেন লাখ টাকা রোজগারের পেশা। সেই অসামান্য ত্যাগের জন্যই বাংলার জনগণ তাঁকে ডাকতে শুরু করেছিল “দেশবন্ধু” বলে — দেশের বন্ধু। কবিও ছিলেন তিনি; মালঞ্চ, সাগরসঙ্গীত তাঁরই লেখা কাব্য।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস (সূত্র: Old Indian Photos)
নেতাজির রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস — সম্পর্কের শুরু
সম্পর্কটা আবার দেখা হওয়ার আগেই শুরু হয়েছিল — চিঠি দিয়ে। তরুণের স্বপ্ন গ্রন্থ-সংক্রান্ত তথ্যে (গুডরিডস্) জানা যায়, ১৯২১ সালে কেমব্রিজের ছাত্র সুভাষ দেশবন্ধুকে চিঠিই লিখেছিলেন — দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে।
মানি ভবনের পর সুভাষ পৌঁছে গেলেন কলকাতায়, দেশবন্ধুর কাছে। আনন্দবাজারের ভাষায়, সুভাষচন্দ্র সেদিন “এক জন নেতাকে খুঁজে পেলেন”।
আর আসল ঘনিষ্ঠতাটা জন্মাল জেলের ভেতরে। ১৯২১–২২ সালে দুজনেই বন্দি ছিলেন একই কারাগারে। প্রাচীন গ্রন্থ নেতাজীর জীবনী ও বাণী-র প্রস্তাবনায় (উইকিসোর্স) সোজাসুজি লেখা আছে — কারাগারে দেশবন্ধুর সঙ্গেই সুভাষের গভীর ঘনিষ্ঠতা হয়। জেলখানাই হয়ে উঠল রাজনীতির প্রথম ক্লাসরুম।
নেতাজির জীবনের পুরো গল্প পড়ুন 👉 নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার বিপ্লবী জীবন।

ছাত্রাবস্থার সুভাষচন্দ্র বসু, ১৯২০ (সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স)
মেয়র গুরু, অফিসার শিষ্য — কর্পোরেশনের দিন
১৯২২-র গয়া অধিবেশনে পরিষদে-প্রবেশ প্রস্তাব হেরে যাওয়ার পর দেশবন্ধু কংগ্রেস-সভাপতির পদ ছেড়ে মতিলাল নেহরুদের নিয়ে গড়লেন স্বরাজ দল (জানুয়ারি ১৯২৩)। দলের মুখপত্র “ফরওয়ার্ড” পত্রিকার সম্পাদক হলেন সুভাষ; সে বছরই তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্পাদকও।
১৯২৪ সালে কলকাতা কর্পোরেশনে স্বরাজবাদীদের জয় — মেয়র দেশবন্ধু, প্রথম চিফ এক্সিকিউটিভ সুভাষচন্দ্র। ডেপুটি মেয়র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, অল্ডারম্যানদের মধ্যে শরৎচন্দ্র বসু (আনন্দবাজার পত্রিকা)। ভাবুন তো চিত্রটা — অফিস-টেবিলের দুই পাশে গুরু আর শিষ্য; রাজনীতির হাতেখড়ি হচ্ছে সরাসরি কাজ করতে করতে।
গুরুবোধটা দেশবন্ধুর রক্তেই মিশে ছিল। একদিন নিজের গৃহশিক্ষককে ফি পরিশোধের কথায় তিনি বলেছিলেন — “পিতৃঋণের মতো গুরুঋণও তো একটা আছে।” সেই মানুষের হাতেই তরুণ সুভাষের গড়া। Techedu360-তে আমরা এরকম মানবিক পেছনের গল্পগুলোই বেশি খুঁজি।
বেঙ্গল প্যাক্ট — গুরুর স্বপ্ন, শিষ্যের খসড়া
দেশবন্ধুর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল হিন্দু-মুসলিম ঐক্য। ১৬ ডিসেম্বর ১৯২৩ স্বরাজ-দলের সভায় গৃহীত হলো সেই বিখ্যাত চুক্তি — বেঙ্গল প্যাক্ট। সিলেট টুডে-র প্রবন্ধের তথ্য বলে, দেশবন্ধুর নির্দেশেই চুক্তির খসড়া তৈরি করেছিলেন নেতাজি সুভাষ বসু।
কিন্তু কোকনদা অধিবেশনে (ডিসেম্বর ১৯২৩) চুক্তিটা বাতিল হয়ে গেল। দেশবন্ধুর জবাব আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল: “তোমরা সভার সিদ্ধান্তসমূহ থেকে বেঙ্গল প্যাক্টকে মুছে ফেলতে পার, কিন্তু কংগ্রেস থেকে বাংলাকে বাদ দিতে পারবে না।” এরপর ১৯২৪ সালের জুনে সিরাজগঞ্জে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনে তিনি চুক্তির শর্তগুলো ফের অনুসমর্থন করিয়ে নেন।
এই ঐক্যের শিক্ষাই পরে শিষ্যের রাজনীতির ভিত হলো — সেটা বুঝতে বেশি দেরি হয়নি।
দার্জিলিং, ১৯২৫ — জেলখানায় শোকের চিঠি
১৯২৪-র শেষ দিকে সুভাষ আবার বন্দি হন; জানুয়ারি ১৯২৫-এ তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ব্রহ্মদেশের মান্দালয় জেলে। আর সেই জেলেই বন্দি থাকতে তাঁর কানে এলো সবচেয়ে কঠিন খবরটা — ১৬ জুন ১৯২৫, দার্জিলিংয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন দেশবন্ধু। বয়স তখন মাত্র ৫৪।
মান্দালয় থেকে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে (১২ আগস্ট ১৯২৫, বাংলালাইভ-এ প্রকাশিত) সুভাষের সেই ভাঙা মন এখনও চোখে ভাসে। তিনি লিখেছিলেন: “আমরা করিতাম দেশবন্ধুর কাজ” — আর আক্ষেপ করে লিখেছেন, দেশবন্ধুর অকাল-মৃত্যুর জন্য তাঁর দেশবাসী ও অনুগামীরাও “কতকটা দায়ী”।
শোকে গভীর হয়ে উঠেছিল গোটা বাংলা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন — “এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ / মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।” আর আবুল কালাম আজাদের মন্তব্য ছিল (বাংলাপিডিয়া): দেশবন্ধু অকালে মারা না গেলে “দেশে নতুন অবস্থা সৃষ্টি করতেন”।
গুরুর পরে শিষ্য — যা থেকে গেল
১৯২৭ সালের মে মাসে মুক্তি পেয়ে সুভাষ ফিরলেন দেশে। গুরু তখন নেই — কিন্তু শেখা-পাঠের কোনো ঘাটতি ছিল না। অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারা, সংগঠন-চালনার পাট, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার সাহস — সবই গুরুর দেওয়া।
১৯৩৯ সালে নেতাজি গড়লেন ফরোয়ার্ড ব্লক। ঐতিহাসিকদের ধারণা, নামটা এসেছিল দেশবন্ধুর সেই “ফরওয়ার্ড” পত্রিকা থেকেই — গুরুর উত্তরাধিকার শিষ্যের দলনামায়ও। সেই ধারাই পরে গিয়ে মেশে সশস্ত্র স্বাধীনতার স্বপ্নে — পড়ুন 👉 আজাদ হিন্দ ফৌজের পুরো ইতিহাস।
আর কেমব্রিজ-দিনের সেই চিঠিসহ জেলের চিঠিগুলো নিয়ে ১৯২৮ সালে বেরিয়েছিল যে বই — “তরুণের স্বপ্ন” — সেটা ২০২৫ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে দশম শ্রেণিতে পড়ানো হচ্ছে (আনন্দবাজার)। গুরু-শিষ্যের কথাবার্তা এখন স্কুলের বইয়ে।
নেতাজির রাজনৈতিক গুরু দেশবন্ধু — টাইমলাইন এক নজরে
নেতাজির রাজনৈতিক গুরু সম্পর্কের পুরো ঘটনাক্রমটা এক টেবিলে সাজিয়ে দিলাম:
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ১৯২১ | কেমব্রিজ থেকে দেশবন্ধুকে চিঠি; জুলাইয়ে মানি ভবন, পরে কলকাতায় প্রথম দেখা |
| ১৯২১–২২ | একই কারাগারে বন্দি — ঘনিষ্ঠতা জন্মায় |
| জানু ১৯২৩ | স্বরাজ দল প্রতিষ্ঠা; “ফরওয়ার্ড” পত্রিকার সম্পাদক সুভাষ |
| ডিসে ১৯২৩ | বেঙ্গল প্যাক্ট গৃহীত; কোকনদা অধিবেশনে বাতিল |
| ১৯২৪ | কর্পোরেশন-জয়: মেয়র দেশবন্ধু, CEO সুভাষ; সিরাজগঞ্জে প্যাক্ট পুনঃঅনুসমর্থন |
| জানু ১৯২৫ | সুভাষ মান্দালয় জেলে |
| ১৬ জুন ১৯২৫ | দার্জিলিংয়ে দেশবন্ধুর প্রয়াণ (৫৪) |
| ১২ আগ ১৯২৫ | মান্দালয় থেকে শরৎচন্দ্রকে শোকের চিঠি |
| ১৯২৮ | “তরুণের স্বপ্ন” প্রকাশ |
| ১৯৩৯ | ফরোয়ার্ড ব্লক — গুরুর নামধারা |
| ২০২৫ | “তরুণের স্বপ্ন” দশম শ্রেণির পাঠ্যে |
বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর
নেতাজির রাজনৈতিক গুরু কে ছিলেন?
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। তাঁর নেতৃত্বেই সুভাষচন্দ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন।
চিত্তরঞ্জন দাসকে “দেশবন্ধু” বলা হয় কেন?
অসহযোগে লাভজনক আইন-পেশা ছেড়ে দেওয়াসহ তাঁর ত্যাগ আর দেশকর্মের জন্য বাংলার জনগণই নাম দিয়েছিল — “দেশের বন্ধু”।
কলকাতা কর্পোরেশনে নেতাজির পদ কী ছিল?
১৯২৪ সালে কর্পোরেশনের প্রথম চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার; মেয়র ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস।
দেশবন্ধুর মৃত্যুর সময় নেতাজি কোথায় ছিলেন?
ব্রহ্মদেশের (আজকের মিয়ানমার) মান্দালয় জেলে বন্দি ছিলেন; সেখান থেকেই শরৎচন্দ্রকে শোকের চিঠি লিখেছিলেন।
“তরুণের স্বপ্ন” বইটা কী?
নেতাজির চিঠি-প্রবন্ধের সংকলন (১৯২৮) — এতে দেশবন্ধুকে লেখা চিঠিও আছে; ২০২৫ থেকে পশ্চিমবঙ্গে দশম শ্রেণির পাঠ্য তালিকায় যুক্ত।
দেশবন্ধুর পৈতৃকভিটা কোথায়?
আজকের বাংলাদেশে — মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের তেলিরবাগ গ্রামে।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও নেতাজি — গল্পটা শেষ পর্যন্ত একটাই জিনিসের: সেরা গুরু আর সেরা শিষ্যের যোগফল। গুরু চলে গেছেন মাত্র চুয়ান্ন বছর বয়সে; কিন্তু তাঁর দেখানো পথেই শিষ্য চলে গেছেন ইতিহাসের শিখরে। আর মজার ব্যাপার — গুরুর সঙ্গে শিষ্যের কথাবার্তা আজ স্কুলের বইয়ে পড়ছে নতুন প্রজন্ম। সত্যিকারের গুরু কখনও মরেন না — তাঁরা বেঁচে থাকেন শিষ্যের কাজে।
নেতাজির পুরো জীবনের গল্প পড়ুন 👉 নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার বিপ্লবী জীবন। আর মৃত্যু-পরবর্তী রহস্যের অধ্যায় 👉 গুমনামী বাবা কী নেতাজি?। আরও পড়তে পারেন — আগরতলা মামলার আসল ইতিহাস, নবাব সিরাজউদ্দৌলা।
একটা প্রশ্ন রইল: আপনার মনে হয় — দেশবন্ধু না থাকলে ভারতীয় রাজনীতিতে নেতাজির জায়গাটা কেমন হতো? কমেন্টে বলুন।

