১৯৪৩ সালের সেই দিন। এই ব্লগে বিস্তারিত জেনে নিন আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস। সিঙ্গাপুরের ক্যাথে বিল্ডিংয়ে জমে উঠেছিল হাজার হাজার মানুষের ভিড়। মাইকের সামনে দাঁড়ালেন এক মানুষ, আর বাতাসে ভেসে উঠল সেই কথা — “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিয়ে যাব।” ওই ঘোষণার পরেই দাঁড়িয়ে গেল এক এমন সেনাবাহিনী, যার ছিল নিজস্ব সরকার, মুদ্রা, এমনকি নিজস্ব পতাকাও। নাম — আজাদ হিন্দ ফৌজ।
ব্রিটিশ শাসকদের সবচেয়ে বড় ভয় ছিল এই বাহিনীকে ঘিরেই। অথচ তাদের পুরো গল্পটা আজও ভালো করে জানা নেই আমাদের অনেকের। তাই Techedu360-এর এই লেখায় আমরা খুলছি ইতিহাসের সেই অজানা পৃষ্ঠাগুলো।
এই লেখায় আমরা জানবো
- আজাদ হিন্দ ফৌজ আসলে কী, আর “কে গঠন করেন” প্রশ্নের সরাসরি উত্তর
- নিজস্ব মুদ্রা-ব্যাংক-পতাকা নিয়ে আজাদ হিন্দ সরকার
- রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট আর ইম্ফল-কোহিমার যুদ্ধ
- পতন, রেড ফোর্ট ট্রায়াল আর শেষ উত্তরাধিকার
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস
আজাদ হিন্দ ফৌজ বা ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনী (INA) — দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গঠিত এক সশস্ত্র বাহিনী। লক্ষ্য একটাই: ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা।
তবে এই বাহিনী আসলে হয়েছিল দুই দফায় — ১৯৪২ সালে আর নেতাজির হাতে ১৯৪৩ সালে। চলুন শুরু থেকে।
প্রথম দফা: মোহন সিংয়ের আইএনএ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মালয় আর সিঙ্গাপুর জয়ের সময় জাপানের হাতে বন্দি হয় হাজার হাজার ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্য। ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের ফারার পার্কে জাপানিরা সেই বন্দিদের তুলে দেয় ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর হাতে — সেখানেই জন্ম হয় প্রথম আইএনএ-র।
এরপর টোকিওতে মার্চ ১৯৪২-এর সম্মেলনে ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়; জুনে ব্যাংকক সম্মেলনে লিগের সভাপতিত্ব নেন রাশবিহারী বসু। যুদ্ধবন্দি আর প্রবাসী ভারতীয়রা ঢলে ঢলে যোগ দিতে থাকেন।
কিন্তু জাপানিদের চাই আর ভারতীয়দের স্বপ্ন মিলছিল না ঠিকমতো। ভেদ বাড়তে বাড়তে ডিসেম্বর ১৯৪২-এ প্রথম আইএনএ ভেঙে যায় — মোহন সিংকেও আটক করে জাপানিরা।
রাশবিহারী বসু: যাঁর হাতে ইতিহাস বদলাল
এই লিগ আর আইএনএ-র বীজ যাঁর হাত ধরে বপন হয়, তিনি বাংলার ছেলে রাশবিহারী বসু। ১৮৮৬ সালে কলকাতায় জন্ম। ফ্রান্সে চিকিৎসা আর জার্মানিতে প্রকৌশল পড়া এই তরুণ আরামদায়ক জীবন ফেলে বেছে নেন বিপ্লবী পথ।
লর্ড হার্ডিং-কাণ্ড, গদর বিদ্রোহ, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা — শেষে ১৯১৫ সালে জাপানে পালাতে হয় তাঁকে। সেখানে বছরের পর বছর কাটিয়ে জোগাড় করেন প্রবাসী ভারতীয়দের সমর্থন। আর ১৯৪৩ সালে তিনিই টোকিওতে ডেকে পাঠান সুভাষ চন্দ্র বসুকে — পরে নিজ হাতে সঁপে দেন পুরো নেতৃত্ব।

জাপানে রাশবিহারী বসু, স্ত্রী তোশিকোর সঙ্গে (সূত্র: Old Indian Photos)
নেতাজির পুনর্গঠন: রক্ত-অঙ্গীকার
জার্মানি থেকে সাবমারিনে সমুদ্রের নিচ দিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ১৯৪৩ সালের জুলাই সিঙ্গাপুর পৌঁছান নেতাজি। রাশবিহারীর হাত থেকে দায়িত্ব নিয়ে তিনি ভাঙা বাহিনীটাকে নতুন করে গড়ে তোলেন।
সঙ্গে যোগ হয় তাঁর পরিচিত স্লোগান “দিল্লি চলো” আর “জয় হিন্দ”। নীতিবাক্য হলো — ইত্তেফাক, ইতমাদ, কুরবানি (একতা, বিশ্বাস, আত্মত্যাগ)। কুচকাত্তয়াজের গান “কদম কদম বড়ায়ে জা”। উইকিপিডিয়ার হিসাবে বাহিনীতে তখন প্রায় ৪৩ হাজার সদস্য ছিল।
আজাদ হিন্দ সরকার: মুদ্রা, পতাকা, বিচার
আসল ঘটনাটা ঘটে ২১ অক্টোবর ১৯৪৩। সিঙ্গাপুরে বসে নেতাজি ঘোষণা করেন স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার — আরজি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ। নিজেই সামলালেন প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর প্রতিরক্ষামন্ত্রী — তিনটাই।
তিন দিন পর পাদাং ময়দানে ৫০ হাজার মানুষের সামনে, মাঝরাত পেরিয়ে সেই রাতেই তিনি ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।
স্বীকৃতি মিলল জাপান, জার্মানি, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বার্মাসহ ৯–১১টি দেশের কাছ থেকে। সরকারের ছিল নিজস্ব আজাদ হিন্দ ব্যাংক — ১০ টাকার কয়েন থেকে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত নোট ছাপা হতো, নোটে থাকত নেতাজির ছবি। থাকত নিজস্ব ডাকটিকিট আর তিরঙ্গাও (সূত্র: ABP Ananda-র প্রতিবেদন)। জাপানের কাছে মিলল আন্দামান-নিকোবরের অধিকার — নাম রাখা হলো শহীদ আর স্বরাজ।

‘ব্যাংক অব ইন্ডিপেন্ডেন্ট’-এর ছাপা নোট — এটির ছবিটি ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগালের (সূত্র: Heritage Times)

আজাদ হিন্দ সরকারের ডাকটিকিট — বাঘ-চিহ্নিত পতাকাসহ তিন সৈন্য (সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স
কংগ্রেস ছেড়ে নেতাজি এই পথে আসার পুরো গল্প জানতে পড়ুন — নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার বিপ্লবী জীবন।
রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট: যুদ্ধের নারী-মুখ
সেই বাহিনীর সবচেয়ে চমকের ধারাটাই এর নারীরা। ১৮৫৭-এর ঝাঁসির রানিকে স্মরণেই গড়া হয় পুরোদস্তুর রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট — ভারতে এমন পূর্ণাঙ্গ নারী-ব্যাটালিয়ন এটাই প্রথম।
নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন — পরে আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রীও। পরিচিতি পেলেন লক্ষ্মী সেহগাল নামে।
যুদ্ধের ময়দান: আরাকান থেকে ইম্ফল-কোহিমা
১৯৪৪-এর শুরুতে আইএনএ-র শীর্ষ কমান্ড সরে যায় রেঙ্গুনে। প্রথম চাপ পড়ে আরাকান ফ্রন্টে — বাহাদুর গ্রুপ আর শাহ নওয়াজের ব্রিগেড লড়ে এগিয়ে। তারপরই সেই যাত্রা: চিন্দউইন নদী পার হয়ে বাহিনী ঢুকে পড়ে ভারতের দিকে।
মণিপুরের মোয়িরাংয়ে ওড়ে তিরঙ্গা — ভারতীয় দলের হাতে ভারতের মাটিতে প্রথম পতাকা। পালেল এয়ারস্ট্রিপ জয় করেন মেজর প্রীতম সিং।
কিন্তু মৌসুমির ভারী বৃষ্টি, সরবরাহসংকট আর অক্ষশক্তির পরপর বিপর্যায়ে পিছু হঠতে হয় তাদের। মজার তথ্য — লন্ডনের ন্যাশনাল আর্মি মিউজিয়ামের এক জরিপে এই ইম্ফল-কোহিমা যুদ্ধ “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ যুদ্ধ” ঘোষিত হয়েছিল (সূত্র: Editorji)।
আজাদ হিন্দ ফৌজের পতন: ইরাবতীর তীরে শেষ দিন
ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫। ইরাবতী নদীর তীরে নারো ব্রিগেডের শেষ লড়াই — কর্নেল গুরবক্স সিং ধিলন-এর নেতৃত্বে। কিন্তু ব্রিটিশ চতুর্দশ আর্মির চাপ সামলানো গেল না। পড়ে গেল রেঙ্গুন, ব্যর্থ হলো স্বপ্নের অভিযান।
যুদ্ধ শেষে বড় অংশই ভারতে ফিরে এল — আর সামনে অপেক্ষা করছিল রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ।
রেড ফোর্ট ট্রায়াল: দেশজুড়ে আলোড়ন
নভেম্বর ১৯৪৫। লাল কেল্লায় (রেড ফোর্ট) শুরু হলো বিচার — শাহ নওয়াজ খান, প্রেম সেহগাল আর গুরবক্স সিং ধিলন-এর। কিন্তু যা ভাবেনি ইংরেজ সরকার, তাই হলো — পুরো দেশ তিন আইএনএ অভিযুক্তের পাশে দাঁড়িয়ে গেল।
সেই আলোড়নের উত্তাপে ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহের পেছনেও আইএনএ-জাগানো মনোভাব কাজ করেছিল বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশ ভরসা তখন প্রায় তলানিতে।
উত্তরাধিকার ও এক অজানা অধ্যায়
স্বাধীনতার পর দেশের সেনাবাহিনীতে আর ফেরেনি বেশিরভাগ প্রাক্তন আইএনএ সদস্য। তাদের স্মরণে তৈরি কলকাতার আইএনএ শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ; প্রতিবছর ২১ অক্টোবর পালিত হয় প্রতিষ্ঠা দিবস।
✨ আর একটা কম-জানা গল্প: নেতাজির সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সাবমারিনে পাঠানো এক রেডিও-ট্রান্সমিটার নিয়ে চার আইএনএ-সদস্য চুপিসারে কলকাতায় স্টেশন স্থাপন করছিল — ১৯৪৪ সালে সেটি জব্দ করা হয়।
জাপানের সঙ্গে হাত মেলানো নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে তর্ক আছেই — কেউ বলেন কৌশল, কেউ বলেন আপস। তবে ত্যাগের প্রশ্নে আর বিভেদ নেই। এরকম হারানো ইতিহাসের আরেকটা গল্প পড়তে পারেন — আগরতলা মামলার আসল ইতিহাস।
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস – টাইমলাইন এক নজরে
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাসের সব মোড় এক টেবিলে —
| সাল | ঘটনা |
|---|---|
| ফেব্রুয়ারি ১৯৪২ | ফারার পার্কে প্রথম আইএনএ |
| মার্চ ১৯৪২ | টোকিও সম্মেলন, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স লিগ |
| জুন ১৯৪২ | ব্যাংকক সম্মেলন |
| ডিসেম্বর ১৯৪২ | প্রথম আইএনএ ভাঙন |
| জুলাই ১৯৪৩ | সিঙ্গাপুরে নেতাজি; নেতৃত্ব হস্তান্তর |
| ২১ অক্টোবর ১৯৪৩ | আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা |
| ২৪ অক্টোবর ১৯৪৩ | ব্রিটেন-আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা |
| ১৯৪৪ | চিন্দউইন–মোয়িরাং–ইম্ফল অভিযান |
| ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ | ইরাবতীর শেষ লড়াই |
| নভেম্বর ১৯৪৫ | রেড ফোর্ট ট্রায়াল |
| ১৯৪৬ | নৌবিদ্রোহ |
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর
আজাদ হিন্দ ফৌজ কে ও কবে গঠন করেন?
দুই দফায়। প্রথমটা ১৯৪২ সালে ক্যাপ্টেন মোহন সিং, রাশবিহারী বসুর উদ্যোগে — আর পূর্ণাঙ্গ রূপটা নেতাজির হাতে ১৯৪৩ সালে। তিনজনের ভূমিকাই আলাদা, গুলিয়ে ফেলবেন না।
আইএনএ-তে কত সেনা ছিল?
আনুমানিক ৪৩ হাজার সদস্য (উইকিপিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী)।
আজাদ হিন্দ সরকারকে কত দেশ স্বীকৃতি দেয়?
জাপান, জার্মানি, ইতালিসহ ৯–১১টি দেশ স্বীকৃতি দিয়েছিল।
রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট বলতে কী বোঝায়?
সম্পূর্ণ নারীদের গঠিত ব্যাটালিয়ন। নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন (পরে লক্ষ্মী সেহগাল)।
আজাদ হিন্দ ফৌজের পতন কীভাবে হলো?
বর্ষা ও সরবরাহসংকটে পশ্চাদপসরণ, তারপর ১৯৪৫ সালে ইরাবতীতে শেষ লড়াইয়ে পরাজয় আর রেঙ্গুন পতনে পুরো অভিযান শেষ হয়।
স্বাধীনতা আন্দোলনে আইএনএ-র অবদান কী?
যুদ্ধ জিততে না পারলেও দেশজুড়ে যে আবেগ জাগাল, রেড ফোর্ট ট্রায়ালের ধাক্কা আর নৌবিদ্রোহে যা পরিণত হলো — ব্রিটিশ আস্থা ভেঙেছিল একরাশ।
আজাদ হিন্দ ফৌজের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত হারার গল্প নয় — বরং জেতার। যুদ্ধে তারা জয় করতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের মনে যে আগুন জ্বালিয়েছিল, সেই আলোতেই শেষমেশ ইংরেজদের ভরসা ভেঙে গেছিল। তাই বলা যায় — তারা হেরেই জিতে গেছিল।
নেতাজির জীবনের পুরো গল্প পড়ুন 👉 নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও তার বিপ্লবী জীবন। আর মনে হতে পারে — নেতাজি কি সত্যিই বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন? পড়ুন 👉 গুমনামী বাবা কী নেতাজি?। আরও পড়তে পারেন — নবাব সিরাজউদ্দৌলা, কর্ণেল এম এ জি ওসমানী।
একটা প্রশ্ন রইল: আইএনএ-র কোন অধ্যায়টা আপনার সবচেয়ে প্রিয় রক্ত-স্লোগান, না মোয়িরাং পতাকা? কমেন্টে জানান।

