আনারকলি

আনারকলি এর জীবনী এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনা

by Sayedur Rahman Sayed

আনারকলির প্রকৃত নাম নাদিরা বেগম। অনেকে বলেন শার্ফ-উন-নিসা। আনারকলি ছিলেন এক ইরানীয় সওদাগরের সুন্দরী কন্যা। আনারকলির বিষয়ে প্রথম জানা যায় ইংরেজ পর্যটক ও বণিক উইলিয়াম ফিঞ্চের গ্রন্থ থেকে, যিনি আগস্ট ২৪, ১৬০৮ সালে ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। আনারকলি হটাৎ একদিন তার পিতার সঙ্গে আফ্রিকার উত্তর উপকূল থেকে সওদাগরি জাহাজে করে ভ্রমণ করেন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। যাত্রাপথে জলদস্যুরা তার বাবার আক্রমণ চালায় এবং হত্যা করে, আনারকলি কে অপহরণ করে এবং ইস্তাম্বুলের ক্রীতদাস বাজারে বিক্রি করে দেয়। পরবর্তীতে মনোরঞ্জনের নানারকম কৌশল শিখেন  পরবর্তীতে তার অবস্থান হয় এক ধনাঢ্য পরিবারে। ওই পরিবারের ধনাঢ্য ব্যক্তি তাকে কিছুদিন পর তুরস্কের সুলতানের কাছে নজরানা পাঠান।

তুরষ্কের সুলতান আনারকলিকে সম্রাট আকবরের কাছে হস্তান্তর করেন। সম্রাট তার নাম দিয়েছেন আনারকলি কারন মেয়েটির গায়ের রং ছিল ডালিমের দানার মতো লাল টসটসে।

আনারকলি ও সেলিমের কাহিনী

মোমবাতির স্বল্প আলোতে শাহজাদা সেলিম দেখলেন আনারকলির মুখন্ডল, ডিম্বাকৃতি এবং থুতুনিতে চিড় আছে,নাকটি ছোট কিন্তু খাড়া। তবে সবচেয়ে আকর্ষনীয় তার চোখ যা দেখে সেলিম মুগ্ধ, আগে কখন ও দেখেনি। সেলিমের হৃদ স্পন্দন প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার ন্যায় আনারকলিকে দেখে। সেলিম চিন্তা করতে লাগলেন আনারকলি কে তার পেতেই হবে, এ ছাড়া কোন উপায় নেই, সেলিম ভূলে গেল আনারকলি তার বাবার রক্ষিতা।

এতো রূপ কোন মানবী (আনারকলি)অঙ্গে থাকতে পারে সেলিম তা আগে কখনো দেখেন নি। আনারকলিকে পেতে সেলিম লোভ দেখিয়ে জব্দ করেন সম্রাট আকবরের হেরেমের রক্ষী সারাকে। আকবর তিন সপ্তাহের জন্য শিকারে গেলে হেরেমের রক্ষী সারা গোপনে আনার কলিকে শাহজাদা সেলিমের খেদমতে হাজির করেন। পরবর্তীতে শাহজাদা সেলিম স্পষ্ট হন যে, আনারকলিও তার প্রেমে মজেছিলেন।

তারা গোপনে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। তবে তাদের মধ্যকার সাক্ষাত গোপন রাখা হতো। তাদের রোমান্টিক সম্পর্কের সময় আনারকলির বয়স ছিল চল্লিশের কোঠায় আর শাহজাদা সেলিমের বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়।

মুঘল সম্রাট আকবরের পুত্র সেলিম প্রেমে পড়েন রাজ্যের নর্তকী অনিন্দ্য সুন্দরী আনারকলির। এই সম্পর্ক কখনোই মেনে নেন নি সম্রাট আকবর। সম্রাট আনারকলিকে সেলিমের চোখে খারাপ প্রমাণ করতে নানা ধরনের কর্মকান্ড পরিকল্পনা করেন।

সন্তানের বিরুদ্ধে আকবর

পিতার এ  পরিকল্পনার কথা জানামাত্র সেলিম নিজ পিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু শক্তিশালী আকবর বাহিনীর কাছে সেলিম খুব সহজেই পরাজিত হয়ে যান। আকবর নিজ সন্তানের মৃত্যুদন্ড আদেশ করেন। তখন প্রিয়তম(আনারকলি) সেলিমের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনের বিনিময়ে সেলিমের জীবন ভিক্ষা চান, আকবর এই প্রস্তাব এ রাজি হয়ে বন্দী করে আনারকলিকে হেরেম খানায় নিয়ে যান। সেখানে সেলিমের উপস্থিতিতে আনারকলিকে জ্যান্ত কবর দেবার ঘোষণা দেন যেন, আনারকলি তিলে তিলে মারা যায়। পরবর্তীতে জানা যায় যে, সেলিমের অনুরোধে তার দাদী হামিদা অর্থাৎ সম্রাট আকবরের মা আনারকলিকে গোপনে বিষ সরবরাহ করেন, যেন কষ্ট পেয়ে মারা না যেয়ে একেবারে মারা যান আনারকলি।

আনারকলির সমাধি

পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত রয়েছে আনারকলির সমাধি। পরবর্তীতে সেলিম আনারকলির স্মৃতির উদ্দেশে এক সমাধিসৌধ নির্মাণ করেন লাহোর নগরীতে। আজো সেটি আছে অমলিন।

১০০৮ হিজরি (১৫৯৯-১৬০০ সাল)আনারকলিকে মৃত্যুদণ্ড দানের তারিখ এবং ১০২৪ হিজরি (১৬১৫-১৬ সাল) সৌধ নির্মাণের তারিখ। লাহোরে পাঞ্জাব সচিবালয় প্রাঙ্গনে মল রোডের পাশেবিরাট সৌধটি রয়েছে।সৌধটি জনসাধারণের জন্য উন্মু্‌ক্ত করে রাখা হয়েছে। বর্তমানে ভবনটি একটি দলিল-দস্তাবেজের সংরক্ষণাগার হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে,বর্তমানে পাঞ্জাবের রেকর্ড অফিস। ব্রিটিশ শাসন আমলে জায়গাটি একটি গীর্জায় রূপান্তরিত করা হয়েছিল। মল রোডের নিকটবর্তী বাজারের নাম আনারকলি। আনারকলির নামানুসারে এ বাজারের নামকরণ করা হয়। পাকিস্তানে বাজার টি প্রায় ২ শো বছর আগের সবচেয়ে পুরনো বাজার। সৌধটি অষ্টাভুজাকৃতির এবং মধ্যেখানে একটি বিশাল ছাদ রয়েছে। ৮টি অষ্টভুজাকৃতির গম্বুজ। গম্বুজগুলো স্তম্ভের ওপর নির্মিত।

আনারকলি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ

আনারকলি ও সেলিমের প্রেম কাহিনী  নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯২৮ সালে “লাভস অব অ্যা মোগল প্রিন্স” নামে প্রথম একটি ছবি নির্মাণ করা হয়। ১৯৫৩ সালে ভারতে আনারকলি নামে আরেকটি ছবি নির্মাণ করা হয়। ছবিতে আনারকলি চরিত্রে অভিনয় করেন বীনা রায়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে আনারকলি নামে আরেকটি ছবি মুক্তি পায়। নূরজাহান হলেন ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র। পরবর্তীতে ১৯৬০ সালে কে. আসিফ পরিচালিত মোগল-ই-আজম মুক্তি পায়। এ ছবিতে আনারকলি চরিত্রে অভিনয় করেন অভিনেত্রী মধুবালা। ছবিটির কিছু অংশ ছিল রঙ্গীন। ২০০৪ সালে পুরোপুরি রঙ্গীন ছবি হিসাবে মোগল-ই-আজম মুক্তি পায়। ২০০৩ সালে শোয়েব মনসূরের স্বল্পদৈর্ঘ্য ধারাবাহিক মিউজিক ভিডিও ইশকে ইমান আলী আনারকলি চরিত্রে অভিনয় করেন।

সেনবংশের রাজা লক্ষ্মণসেন এর অস্থায়ী রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করে দখল করে নিয়ে ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের এই ব্লগটি পড়ুন

Related Posts

Leave a Comment