এ এইচ এম কামরুজ্জামান

এ এইচ এম কামরুজ্জামান এর জীবনী

by Sarwar Husain

বাংলাদেশের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামান(২৬ জুন ১৯২৩ -৩ নভেম্বর ১৯৭৫)। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম নেতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর অচলাবস্থার প্রেক্ষিতে গণ বিদ্রোহ দমনে পূর্ব পাকিস্তানের শহর ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক সামরিক অভিযান ও বিমান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও স্বাধীকার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এবং বাঙালি গণহত্যার প্রক্ষিতে এই জনযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের ফলে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে অপারেশন সার্চলাইট পরিচালনা করে এবং নিয়মতান্ত্রিক হত্যা শুরু করে। এর মাধ্যমে জাতীয়বাদী সাধারণ বাঙালি নাগরিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং পুলিশ ও ই পি আর কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে গঠিত অস্থায়ী সরকারের স্বরাষ্ট্র,কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। একজন নির্লোভ,সৎ, ও দেশপ্রেমিক নেতা হিসাবে আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামান পরিচিত ছিল।

জন্ম

 এ এইচ এম কামরুজ্জামান বর্তমান নাটোর জেলার অন্তর্গত বাগাতিপাড়ার মালঞ্চী রেলস্টেশন সভানবাগ মিরপুর গ্রামে মামার বাড়িতে ১৯২৩ সালের ২৬ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার বাড়ি ছিল আশায় জেলার কাদিরগঞ্জ মহাল্লায়। তিনি ছিলেন বনেদি জমিদার পরিবারের সন্তান। তার পিতার নাম আবদুল হামিদ ও মাতা বেগম জেবুন্নেছা। তাদের বারটি সন্তানের  মধ্যে এ এইচ এম কামরুজ্জামান ছিলেন সবার বড় সন্তান। তার ডাকনাম ছিল হেনা।

পারিবারিক জীবন

 ১৯৫১ সালে কামরুজ্জামান জাহানারা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জাহানারা বেগম বগুড়া জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলার চামরুল গ্রামের আশরাফ্উদ্দিন তালুকদারের মেয়ে। আশরাফ উদ্দিন তালুকদার ঐ অঞ্চলের জোতদার হিসেবে পরিচিতি ছিলেন।

পারিবারিক জীবনে কামরুজ্জামান ছয় সন্তানের পিতা। এ এইচ এম কামারুজ্জামানের বড় ছেলে এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন (জন্ম ১৪ আগস্ট ১৯৫৯) রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র। মেজো ছেলে এ এইচ এম এহসানুজ্জামান  স্বপন (জন্ম ১৯৬১)। বর্তমানে তিনি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরিরত রয়েছেন। মেয়েদের নাম ফেরদৌস মমতাজ পলি (জন্ম ১৯৫৩),দিলারা জুম্মা  রিয়া (জন্ম ১৯৫৫), রওশন আক্তার রুমি (জন্ম ১৯৫৭) ও কবিতা সুলতানা চুমকি (জন্ম ১৯৬৪ )।

এ এইচ এম কামরুজ্জামান এর শিক্ষাজীবন

এ এইচ এম কামরুজ্জামান লেখাপড়া শুরু করে কলেজিয়েট স্কুল থেকে। তাঁর এক ফুপা ছিলেন  রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক। তিনি রাজশাহী থেকে চট্টগ্রাম বদলী হয়ে যাওয়ার সময় কামরুজ্জামানকে সাথে করে নিয়ে যান এবং চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি করে দেন। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে তিনি মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯৪৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। এরপর এম এইচ এম কামরুজ্জামান উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় চলে যান এবং সেখান থেকে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ১৯৪৬ সালে অর্থনীতিতে  অনার্স পাশ করেন। এ এইচ এম কামরুজ্জামান রাজশাহী আইন কলেজ হতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে রাজশাহী জজ কোর্টে  আইন ব্যবসা শুরু করেন।

এ এইচ এম কামরুজ্জামান এর পাকিস্তান আমল ও রাজনৈতিক জীবন

এ এইচ এম কামরুজ্জামান ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি ১৯৪২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র লীগের রাজশাহী জেলা শাখার সম্পাদক হন। তিনি ১৯৪৩-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র লীগের নির্বাচিত সহ সভাপতি ছিলেন। কামরুজ্জামান ছিলেন পারিবারিক ভাবে রাজনীতি সচেতন। তার দাদা হাজী লাল মোহাম্মদ সরদার কংগ্রেস রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। এ কারণে কংগ্রেস ও প্রথম সারির মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তার পিতা মুসলিম লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন রাজশাহী অঞ্চলের উত্তর লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির সময় বাংলাদেশের পুরনো বিভক্ত হয়। তখন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ দুটি প্রদেশ গঠিত হয়। তখন পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের প্রদেশ ছিল। তিনি ১৯৪৪৬ সাল থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত অবিভক্ত বাংলাদেশের আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। তাই তার সম্পর্কে আগ্রহী হওয়া স্বাভাবিক ছিল।

মুক্তিযুদ্ধে এ এইচ এম কামরুজ্জামান এর অবদান

এ এইচ এম কামরুজ্জামান ১৯৫৬ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৭ সালে রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। 1১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনের আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে পুনরায় তিনি রাজশাহী থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশে অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করে। এসময় শেখ মুজিবুর রহমান পাঁচজন সদস্য বিশিষ্ট দলীয় হাইকমান্ড গঠন করেন। এ এইচ এম কামরুজ্জামান এই হাই কমান্ডের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার কারণে বাঙ্গালীদের মনে সহিংসতা দেখা দেয়। তখন বাঙালিরা শেখ মুজিবের ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সরকার নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালিদের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দেয়। যা ইতিহাসের অপারেশন সার্চলাইট নাম দেওয়া হয়। এই গণহত্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের আদেশে পরিচালিত ১৯৭০  এর নভেম্বরে সংঘটিত অপারেশন ব্লিটজ্‌ এর পরিবর্তী অনুষঙ্গ। তখন পাকিস্তানি বাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে পাকিস্তান নিয়ে যায়। কিন্তু তিনি এর পূর্বেই তার দলের নেতাকর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলেছিলেন। তাই তিনি শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ ও আর ও কয়েকজন নেতা মিলে বগুড়া হয়ে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তাজউদ্দিন সহ অন্যান্য নেতাকর্মীর দেখা হয়। এখানে তারা সকলে মিলে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল গঠিত হয় প্রথম অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার। তার পর ১৭ এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহের পুর সীমান্তবর্তী এলাকা বৈদ্যনাথ তলায় (পরবর্তিতে মুজিবনগর) শপথ গ্রগণ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে এই অস্থায়ী আনুষ্ঠানিক ভাবে যাত্রা শুরু করে। এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে নবগঠিত মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি কঠোর পরিশ্রমী ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে মুক্তাঞ্চল, শরণার্থী শিবির ও সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দিনরাত প্ররিশ্রম করতেন। তিনি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব করেছেন।

মৃত্যু

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বিশ্বাসঘাতকদের হাতে শেখ মুজিবুর রহমানের সহ পরিবারকে হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি চির স্বরণীয় হয়ে থাকবে। অভ্যুত্থানকারীরা  ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যত্থানের সম্মুখীণ হন। মুজিবুর রহমানের হত্যাকারী দেশ থেকে নির্বাস হওয়ার পূর্বে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কতিপয় সেনা কর্মকর্তা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সাবেক বাংলাদেশী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন আলী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে গুলি করে। ঐ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে জেল হত্যা দিবস নামে কুখ্যাত হয়ে আছে।

স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশের একজন কূটনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। স্পিকার হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের এই ব্লগটি পড়ুন

Related Posts

Leave a Comment