বারো ভূঁইয়া নাম এবং তাদের সাম্রাজ্য

by Sayedur Rahman Sayed

বারো ভূঁইয়া অর্থ কি

বারো ভূঁইয়া উৎপত্তি মুসলিম শাসনামলে, সম্রাট আকবরের সময়ে হয়। ‘ভূঁইয়া’ একটি আঞ্চলিক শব্দ। এর অর্থ ভৌমিক বা ভূমির মালিক, ভূস্বামী বা জমিদার। তবে অনেকে শব্দটিকে পদবি হিসাবেও ব্যবহার করেন।

মুঘল সম্রাট আকবর ও জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার বিভিন্ন এলাকা শাসন করতেন বেশ কয়েকজন জমিদার ৷ এই রকম বারো জন এমন শাসক ছিলেন, যাঁদেরকে বোঝানো হতো ‘বারো ভূঁইয়া’ বলে। বাংলায় পাঠান কর্‌রানী বংশের রাজত্ব দূর্বল হয়ে পড়লে তখন বেশ কিছু এলাকার জমিদার একেবারে স্বাধীন রাজার মতো রাজত্ব করতে থাকেন। এরা দিল্লির বাদশার আদেশ স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না৷ সম্রাট আকবর ১৫৭৫ সালে বাংলা দখল করার পর এই সকল জমিদার ঐক্যবদ্ধ হয়ে মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেন।

বারো ভূঁইয়া পরিচয়

বারো ভূঁইয়া

প্রথমে আবুল ফজলের তালিকা নিম্নরূপ

  • ঈশা খাঁন মসনদ-ই-আলা
  • ইবরাহিম নরল
  • করিমদাদ মুসাজাই
  • মজলিস দিলওয়ার
  • মজলিস প্রতাপ
  • কেদার রায়
  • শের খান
  • বাহাদুর গাজী
  • তিলা গাজী
  • চাঁদ গাজী
  • সুলতান গাজী
  • সেলিম গাজী ও
  • কাসিম গাজী।

বাহারিস্তান-ই-গায়েবীতে মির্জ নাথান কর্তৃক উল্লেখ করা বারো ভূঁইয়াদের নামের তালিকা নিম্নরূপ

  • মুসা খান মসনদ-ই-আলা
  • আলাউল খান
  • আবদুল্লাহ খান
  • মাহমুদ খান
  • বাহাদুর গাজী
  • সোনা গাজী
  • আনোয়ার গাজী
  • শেখ পীর
  • মির্জা মুনিম
  • মাধব রায়
  • বিনোদ রায়
  • পাহলওয়ান ও
  • হাজী শামসুদ্দীন বাগদাদী।

সালতানাতের পতনের পর পূর্ব বাংলা

বারো ভূঁইয়া

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে দু’শত বছরের পুরানো স্বাধীন সালতানাতের পতনের পর পূর্ব বাংলায় বিরাজমান বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগে বারো ভূঁইয়াগণ শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন। শেরশাহ  সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহ এর রাজধানী গৌড় জয় করে তাঁর প্রশাসকদের হাতে ন্যস্ত করেন কিন্তু তিনি বাংলার সর্বত্র তাঁর ক্ষমতা সংহত করতে পারেন নি। তাঁর বিরুদ্ধে উচ্ছেদকৃত শাসকদের সমর্থকদের কমপক্ষে তিনটি বিদ্রোহের দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলার নদীবিধৌত এলাকা সব সময়ই কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য একটি সমস্যা ছিল। এ সমস্যা সমাধানকল্পে শেরশাহ বাংলাকে বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ইউনিটে বিভক্ত করেন। কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছোট ছোট এসব ইউনিটের শাসকদের বিদ্রোহ করার কোন শক্তি না থাকায় আধুনিক ঐতিহাসিকগণ বিকেন্দ্রীকরণের নীতিকে অভিনন্দিত করেন। কিন্তু বিকেন্দ্রীকরণের  কুফলও ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্র ইউনিটগুলির শাসকদের বিদ্রোহ করার শক্তি না থাকলেও বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ করার কোন শক্তিও তাদের ছিল না। শেরশাহের বিকেন্দ্রীকরণ নীতির এ কুফল তাঁর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় কয়েকটি বিদ্রোহ দ্বারা প্রমাণিত। আফগান ঐতিহাসিকগণ এ অবস্থাকে মুলুক-উৎ তাওয়াইফ রূপে আখ্যায়িত করেছেন, যার অর্থ বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য ও বিখন্ডায়ন।

শামসুদ্দীন মুহম্মদ শাহ গাজী ও অন্যান্য আফগান শাসকদের অধীনে স্বাধীন শূর বংশের প্রতিষ্ঠা এ বিখন্ডায়ন ও বিশৃঙ্খল অবস্থার অবসান ঘটায় নি। এ আমলে তাজখান কররানী আদিল শাহের (আদালী) দিল্লির দরবার থেকে পালিয়ে বাংলায় চলে আসেন এবং এদেশে লুটপাট চালান। বাংলায় কর্মরত তাঁর ভাই সুলায়মানের সঙ্গে যোগ দিয়ে বাংলার রাজনীতিতে তিনি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীকালে তিনি শূর বংশের গিয়াসউদ্দীন বাহাদুরের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন এবং আরও পরে কররানী বংশের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন। দাউদ খান কররানীর মৃত্যু এবং মুগলদের দ্বারা রাজধানী  সেনা দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পরে মানসিংহ কর্তৃক উড়িষ্যা থেকে বিতাড়িত হয়ে খাজা উসমান ও তাঁর ভাইয়েরা বাংলায় আসেন। সাতগাঁও ও ভূষণার মধ্য দিয়ে তাঁরা বুকাইনগরে (বর্তমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায়) আসেন এবং নিজেদের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটা স্পষ্ট যে, স্বাধীন সালতানাতের পতনের পর (১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) এবং বিশেষত শেরশাহ এর প্রশাসন-ক্ষমতা অর্পনের পর পূর্ব বাংলার ভাটি অঞ্চলে বিশৃঙ্খল অবস্থা এবং সংহতিনাশক শক্তি বিরাজ করছিল। এই বিশৃঙ্খল সময়ে বারো ভূঁইয়াগণ শক্তি সঞ্চয় করেন এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। দু’শত বছর স্থায়ী বাংলার স্বাধীন সালতানাতের উত্তরাধিকারী ছিলেন বারো ভূঁইয়াগণ।

বারো ভূঁইয়াগণ কোন রাজপরিবারের বংশধর ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন জমিদার বা জমির মালিক এবং দেশপ্রেমিক। অদম্য সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তাঁরা দীর্ঘ তিন যুগ ধরে মুগল আগ্রাসন প্রতিহত করেছিলেন। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দের পর ইসলাম খান তাঁদেরকে বশ্যতাস্বীকার করতে বাধ্য করেন। এরপর বারো ভূঁইয়া নামটি শুধু লোককাহিনী এবং গাঁথায় থেকে যায়।

একজন বাঙালি হিসেবে বঙ্গদেশের (প্রাচীন বাংলার) ইতিহাস জানাটা জরুরি। বঙ্গদেশের ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আমাদের এই ব্লগটি পড়ুন

Related Posts

Leave a Comment